গ্রামের প্রত্যন্ত বাড়ি কিংবা নগরের অলিগলি—মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বড় ধরনের জনবল পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আগামী তিন বছরে প্রায় এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মীর পদ সৃষ্টির পাশাপাশি বর্তমানে পৃথক ব্যবস্থাপনায় কাজ করা তিন শ্রেণির মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীকে একটি অভিন্ন কাঠামোয় নিয়ে আসার উদ্যোগ চলছে। নতুন ব্যবস্থায় তাঁদের পরিচিতি হবে ‘সুস্বাস্থ্যকর্মী’ হিসেবে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীর সংখ্যা প্রায় দেড় লাখে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবারকল্যাণ সহকারী ও কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের (সিএইচসিপি) জন্য অনুমোদিত পদ রয়েছে ৫৮ হাজার। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ৪২ হাজার ৯০০ জন। বাকি প্রায় ১৫ হাজার পদ শূন্য রয়েছে। নতুন জনবল যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মীদেরও সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রস্তাবিত সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রে তাঁদের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বর্তমানে আলাদা দপ্তর ও কর্মসূচির অধীনে কাজ করা কর্মীদের একই ধরনের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর ফলে একই বাড়িতে একাধিক কর্মীর সেবা পৌঁছে যাওয়ার পরিবর্তে প্রতিটি পরিবারকে নিয়মিত সেবার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ। নির্বাচনী ইশতেহারে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের ৮০ শতাংশ নারী রাখার কথাও বলা হয়েছে।
সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি জানান, নতুন কর্মীদের পাশাপাশি বর্তমানে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবারকল্যাণ সহকারী ও সিএইচসিপিদেরও একই কাঠামোয় যুক্ত করা হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সমন্বয়ের অভাবে কোনো কোনো বাড়িতে একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী গেলেও অন্য বাড়ি সেবার বাইরে থেকে যায়। নতুন ব্যবস্থায় এ ধরনের অসামঞ্জস্য দূর করাই মূল লক্ষ্য।
তিন শ্রেণির কর্মীর দায়িত্ব হবে সমন্বিত
বর্তমানে মাঠপর্যায়ে তিন ধরনের স্বাস্থ্যকর্মী পৃথক দায়িত্ব পালন করেন। স্বাস্থ্য সহকারীরা মূলত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) অধীনে কাজ করেন। পরিবারকল্যাণ সহকারীদের প্রধান দায়িত্ব জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী বিতরণ ও পরিবার পরিকল্পনাসংক্রান্ত সেবা দেওয়া; তাঁরা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) অধীন। অন্যদিকে কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেন সিএইচসিপিরা, যাঁরা কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের অধীনে কর্মরত।
নতুন ব্যবস্থায় এই পৃথক দায়িত্বের পাশাপাশি সব কর্মীকে সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তাঁরা নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্তত দুই মাসে একবার প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরামর্শ ও সেবা দেওয়ার পাশাপাশি টিকাদান, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী এবং ওষুধ বিতরণের মতো বিদ্যমান কাজও চালিয়ে যাবেন।
তিন ধাপে প্রায় এক লাখ নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কার্যক্রম সমন্বিত করতে গত মার্চে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটির দায়িত্ব ছিল এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা তদারকি করা। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারি কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে।
বিভাগীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কারিগরি কমিটি তাদের প্রতিবেদনে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৯৯ হাজার ৬৫৭টি নতুন পদ সৃষ্টির সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে শহরাঞ্চলের জন্য ৪৯ হাজার ৯৪৫টি এবং গ্রামাঞ্চলের জন্য ৪৯ হাজার ৭১২টি পদ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে শুরুতে ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত আগস্টে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বিবেচনায় ৪৫ হাজার ৭১১টি পদ সৃষ্টির সুপারিশ করে সংস্থাটি। পরে সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ কারিগরি কমিটির বৃহত্তর প্রস্তাব অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব এ এন এম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে ২২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, তিন বছরে ধাপে ধাপে নতুন পদগুলো সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম বছরে শহরাঞ্চলে ৯ হাজার ৯৮৯টি পদ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্বিতীয় বছরে শহরাঞ্চলে আরও ১৯ হাজার ৯৭৮টি এবং গ্রামাঞ্চলে ২৪ হাজার ৮৫৬টি পদ সৃষ্টির কথা রয়েছে। তৃতীয় বছরে বাকি ৪৪ হাজার ৮৩৪টি পদ যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সভায় প্রথম ধাপের ৯ হাজার ৯৮৯টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত পদগুলো নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সব পদ একসঙ্গে সৃষ্টি করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। তবে নিয়োগ কার্যক্রম তিন বছর ধরে পর্যায়ক্রমে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট বৈঠকের কার্যবিবরণীর অপেক্ষা করা হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যমান ব্যবস্থায় সিএইচসিপি, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবারকল্যাণ সহকারীদের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করার নির্দেশও দিয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, হাতে থাকবে প্রযুক্তিনির্ভর সরঞ্জাম
নতুন পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যসেবা শুধু নির্দিষ্ট কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার। বরং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সরঞ্জামসহ কর্মীদের সরাসরি মানুষের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানান, সুস্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কিট দেওয়া হবে। এর সাহায্যে তাঁরা প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পারবেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার ইতিহাস জানবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরামর্শ দেবেন।
এ কাজে প্রযুক্তির ব্যবহারও থাকবে। প্রতিটি কর্মীকে ট্যাবলেট কম্পিউটার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁরা কেন্দ্রীয় তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন এবং বিভিন্ন সেবার মধ্যে সমন্বয় করবেন।
মুহিতের ভাষ্য, এ উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা সহজ হবে। তবে তিন ধরনের কর্মীর প্রশাসনিক কাঠামো, পদমর্যাদা ও বেতন গ্রেড সমন্বয় করা জটিল প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় করেই এ কাজ এগিয়ে নিতে হচ্ছে। তাঁর দাবি, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি অনেকটাই এগিয়েছে এবং প্রশিক্ষণের বিষয়েও কাজ চলছে।
একীভূতকরণ নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্বেগ
সরকারের পরিকল্পনাকে ঘিরে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অবশ্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, চাকরির ধরন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বেতন গ্রেড ও নিয়োগবিধিতে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে এখনো আলোচনা করা হয়নি।
বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন কেন্দ্রীয় সমন্বয় পরিষদের সদস্যসচিব ফজলুল হক চৌধুরী বলেন, তিন শ্রেণির কর্মীর দায়িত্ব ও চাকরির শর্ত এক নয়। স্বাস্থ্য সহকারীরা উচ্চমাধ্যমিক সনদ নিয়ে রাজস্ব খাতের অধীনে ১৬তম গ্রেডে নিয়োগ পান। পরিবারকল্যাণ সহকারীরা মাধ্যমিক সনদ নিয়ে ১৭তম গ্রেডে কাজ করেন। অন্যদিকে সিএইচসিপিরা ১৬তম গ্রেডে থাকলেও তাঁদের চাকরি একটি ট্রাস্টের অধীনে।
তাঁর মতে, এসব পার্থক্য বিবেচনায় না নিয়ে একীভূত কাঠামো তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে জটিলতা দেখা দিতে পারে। ফজলুল হক চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত কাঠামো ও দায়িত্ব সম্পর্কে কর্মীদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য সহকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ পরিবারকল্যাণ সহকারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌসী আক্তার। তাঁর বক্তব্য, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবারকল্যাণ সহকারীদের কাজের ধরন আলাদা। তাঁদের একই ধরনের দায়িত্ব দেওয়া হলে তা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি।
ফেরদৌসী আক্তার বলেন, গণমাধ্যমে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শুনলেও তাঁদের সংগঠনের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। কর্মীদের মতামত না নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও দপ্তরগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন। তবে এ পর্যায়ে কর্মচারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলাদা বৈঠকের সম্ভাবনা কম। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং সেই অনুযায়ী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
একদিকে মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার বড় পরিকল্পনা, অন্যদিকে বিদ্যমান কর্মীদের চাকরির কাঠামো ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ—দুই বিষয়ই এখন উদ্যোগটির বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায় এক লাখ নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন, নিয়োগবিধি ও কর্মপরিধি নির্ধারণের মধ্য দিয়ে এগোতে হবে। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন।



