মূল কনটেন্টে যান
Wednesday, 4 November 2026

যেখানে প্রমাণ কথা বলে...

The Evidence যেখানে প্রমাণ কথা বলে...

বছর শেষে ইসরায়েলকে ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা ট্রাম্পের

নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমঝোতার দাবি মার্কিন প্রেসিডেন্টের; অস্ত্র বিক্রি ও প্রয়োজনে সহায়তা অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত, তবে ২০২৮ সাল পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে বর্তমান চুক্তি

FacebookWhatsAppX / TwitterTelegramLinkedInইমেইল

দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে বছরে প্রায় ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ সহায়তা আর প্রয়োজন নেই—এমন যুক্তি দেখিয়ে চলতি বছরের শেষেই অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ ঘোষণা দেন তিনি।

ট্রাম্পের দাবি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েল এখন অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ; তাই দেশটির আর মার্কিন অর্থসহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে প্রয়োজন হলে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করবে এবং দেশটির কাছে অস্ত্র বিক্রিও অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০১৬ সালে সই হওয়া ১০ বছর মেয়াদি নিরাপত্তা সহায়তা চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ইসরায়েলের জন্য ৩৮০ কোটি ডলার বরাদ্দের কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩০ কোটি ডলার বৈদেশিক সামরিক অর্থায়ন (FMF) এবং ৫০ কোটি ডলার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির জন্য নির্ধারিত। মূলত মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র কেনার কাজে এ অর্থ ব্যবহার করে ইসরায়েল।

‘ইসরায়েলের আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই’
ফক্স নিউজের অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েলকে প্রতিবছর প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু দেশটির সঙ্গে আলোচনা করেই তা বন্ধ করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। তাঁর দাবি, নেতানিয়াহু বিষয়টি বুঝেছেন এবং এ সিদ্ধান্তে সম্মত হয়েছেন।

ট্রাম্পের বক্তব্য, ‘ইসরায়েল আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। আমরা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় তাদের বেশি সহায়তা করি। কিন্তু এখন তাদের আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই।’ তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকবে। তবে নিয়মিত অর্থসহায়তার পরিবর্তে দেশটি নিজেদের অর্থে অস্ত্র কিনতে পারবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কয়েক বছর ধরেই আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে দুই দেশের মধ্যে ঠিক কী ধরনের সমঝোতা হয়েছে এবং তা কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত স্পষ্ট নয়।

২০২৮ সাল পর্যন্ত কার্যকর চুক্তি, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
ট্রাম্পের ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৮ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকা নিরাপত্তা সহায়তা চুক্তি কীভাবে ২০২৬ সালের শেষেই বন্ধ করা হবে। ২০১৬ সালের সমঝোতা অনুযায়ী, বর্তমান অর্থায়ন কাঠামোর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে এ সময়ের আগেই সহায়তা বন্ধের কথা বলেছেন।

এ ক্ষেত্রে মার্কিন কংগ্রেসের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বরাদ্দ ও অর্থ ছাড়ের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ফলে প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পরও চুক্তির অর্থায়ন কীভাবে বন্ধ হবে, তার আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ট্রাম্পও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরেননি।

সহায়তা কমানোর ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু
মার্কিন অর্থসহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা আগেও বলেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। চলতি বছরের জানুয়ারিতে *দ্য ইকোনমিস্ট*কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইসরায়েলকে দীর্ঘমেয়াদে সামরিকভাবে আরও স্বনির্ভর হতে হবে।

২০১৬ সালে বারাক ওবামার প্রেসিডেন্সির শেষ সময়ে দুই দেশের মধ্যে ৩৮০০ কোটি ডলারের ১০ বছর মেয়াদি নিরাপত্তা সহায়তা চুক্তি সই হয়। ২০১৯ সাল থেকে কার্যকর হওয়া এ চুক্তিকে সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো একক দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা প্রতিশ্রুতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দেশটি বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা পেয়েছে। কয়েক দশক ধরে এ সহায়তা দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আলোচনায়
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ট্রাম্পের এ ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি মার্কিন রাজনীতিতে বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের একাংশের সমালোচনার মুখে পড়েছে। ট্রাম্পও সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ এ অর্থসহায়তাকে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে প্রচারণার বিষয় হিসেবে ব্যবহার করছে।

ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহায়তার ভবিষ্যৎ শুধু দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্কের বিষয় নয়; যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।

ট্রাম্পের ঘোষণাটি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল নিরাপত্তা সম্পর্কের দীর্ঘদিনের অর্থায়ন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বার্ষিক অর্থসহায়তা বন্ধ হলেও অস্ত্র বিক্রি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফলে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হওয়ার বদলে নতুন কাঠামোয় রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।