প্রথম বেতন থেকে ১২ আগস্ট ৩২ হাজার টাকা পাঠানোর কথা ছিল; এর তিন দিন আগেই সৌদি আরবের কারখানায় আগুনে মৃত্যু হয় তাঁর
মাকে কথা দিয়েছিলেন, ১২ আগস্ট প্রথম উপার্জনের টাকা পাঠাবেন। সেই টাকায় মা নিজের পছন্দমতো ফল কিনে খাবেন। পাশাপাশি সৌদি আরবে যেতে যে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন, তার কিস্তিও পরিশোধ শুরু করবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর পূরণ করা হয়নি। টাকা পাঠানোর নির্ধারিত দিনের মাত্র তিন দিন আগে সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় আগুনে প্রাণ হারান ৩২ বছর বয়সী শাহিন মন্ডল।
প্রায় তিন মাসের অপেক্ষা শেষে শনিবার দেশে ফিরেছে শাহিনের মরদেহ। গত ৯ আগস্ট রিয়াদের ওই কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শাহিনসহ ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এর মধ্যে প্রথম দফায় গত ২৭ আগস্ট নয়জনের মরদেহ দেশে আনা হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় শাহিনসহ বাকি সাতজনের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার পার নওগাঁ গ্রামে শাহিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে বাড়ির পথে তাকিয়ে আছেন মা নার্গিস বেগম। তাঁর পাশে নির্বাক দাঁড়িয়ে স্ত্রী, ছয় বছরের ছেলে ও আট মাসের কন্যাসন্তান। স্বজনদের পাশাপাশি প্রতিবেশীরাও ভিড় করেছেন বাড়িতে। যে ছেলেকে ঘিরে ছিল সংসারের স্বপ্ন, তাঁর নিথর দেহ ফেরার অপেক্ষায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ির পরিবেশ।
ছেলের কথা মনে পড়তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নার্গিস বেগম। তিনি বলেন, ‘ছেলে ফল কেনার জন্য টাকা পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু আগুনে পুড়ে চলে গেল। আমার সোনার ছেলে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন আমি একা, কীভাবে বাঁচব?’
সংসারের অভাব ঘোচানোর আশায় চলতি বছরের এপ্রিলে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শাহিন। এর আগে নওগাঁর উকিলপাড়ার একটি দোকানে দর্জির কাজ করতেন তিনি। সেই আয় দিয়ে পরিবারের দৈনন্দিন খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই একটু ভালো জীবনের আশায় ধারদেনা করে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
শাহিনের খালা নিলুফা ইয়াসমিন জানান, মাত্র চার বছর বয়সে বাবাকে হারান শাহিন। এরপর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাঁকে বড় করেছেন মা নার্গিস বেগম। ছোটবেলা থেকেই সংসারের অভাব-অনটন দেখে বড় হওয়া শাহিন দর্জির কাজ করে পরিবারের দায়িত্ব সামলানোর চেষ্টা করতেন।
নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই শাহিন অনেক কষ্ট করেছে। দর্জির কাজ করে কোনোরকমে পরিবারের খরচ চালাত। আরও ভালো আয়ের আশায় ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিল।’
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১২ আগস্ট প্রথমবারের মতো ৩২ হাজার টাকা পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলেন শাহিন। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধে এবং বাকি টাকা সংসারের প্রয়োজন মেটাতে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু উপার্জনের প্রথম টাকাটাই আর পরিবারের কাছে পৌঁছায়নি।
শাহিনের মামা আবদুস সালামের কথায়, ‘মাত্র উপার্জন করে বাড়িতে টাকা পাঠানো শুরু করতে যাচ্ছিল শাহিন, ঠিক তখনই মারা গেল। পরিবারটি অসহায় হয়ে গেল।’ এমন পরিস্থিতিতে পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে নিহত সাত বাংলাদেশির মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন নওগাঁর এবং দুজন নাটোরের বাসিন্দা।
শাহিন ছাড়া নওগাঁর অন্য চারজন হলেন হাসিবুল হাসান শুভ, মিনহাজ প্রামাণিক, মাসিদুল সরদার সাজিব ও সাগর আলী। তাঁদের সবার বাড়ি আত্রাই উপজেলায়। আর শাহিনের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলার পার নওগাঁ গ্রামে।
বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে নওগাঁর পাঁচজনের মরদেহ তাঁদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। মরদেহবাহী গাড়ি পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শেষবারের মতো স্বজনদের মুখ দেখার জন্য বাড়িগুলোতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা। পরে সন্ধ্যায় জানাজা শেষে তাঁদের দাফন করা হয়।
প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পেলেও পরিবারগুলোর সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। নিহতদের প্রত্যেকেই ছিলেন নিজ নিজ পরিবারের প্রধান বা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় কেউ মহাজনের কাছ থেকে, কেউবা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। এখন একদিকে স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে ঋণের বোঝা ও উপার্জনের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে দিশেহারা পরিবারগুলো।
শাহিনের মা হয়তো এখন আর ছেলের পাঠানো টাকায় নিজের পছন্দের ফল কিনতে পারবেন না। কিন্তু ঋণ, সংসার আর দুই শিশুসন্তানের ভবিষ্যতের যে দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে শাহিন বিদেশে গিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর সেই দায়ভারই এখন পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।



