হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তিতে এমন একটি শর্ত যুক্ত হয়েছে, যা ঢাকার আশপাশে নতুন বেসামরিক বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে সীমিত করতে পারে। শর্ত অনুযায়ী, শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে আগামী ১৫ বছর অন্য কোনো বেসামরিক বিমানবন্দর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে না।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক জানিয়েছে , জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য তৈরি চুক্তির খসড়ায় এ বিধান রাখা হয়েছে। তবে চুক্তি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।
প্রস্তাবিত শর্তটির অর্থ, নির্ধারিত ১০০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ কিংবা এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা গ্রহণে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা থাকছে না। তবে চুক্তির ১৫ বছর মেয়াদে এসব বিমানবন্দর থেকে প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে না। অর্থাৎ অবকাঠামো তৈরি হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে চালু করার সুযোগ সীমিত থাকবে।
বিষয়টি সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ক্রমবর্ধমান যাত্রীসংখ্যার চাপ সামাল দিতে ঢাকার কাছে আরেকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। একদিকে ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে নতুন বিমানবন্দরের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রস্তাবিত চুক্তির শর্তে একই অঞ্চলে বিকল্প বাণিজ্যিক বিমান পরিবহনের সুযোগ ১৫ বছরের জন্য সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যাত্রীর চাহিদা ছাড়িয়ে যাবে বিদ্যমান সক্ষমতা
বেবিচকের নথি অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বার্ষিক যাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে। অথচ তৃতীয় টার্মিনাল এবং প্রস্তাবিত দুটি পিয়ার বা টার্মিনাল সম্প্রসারণ অংশ নির্মাণের পরও বিমানবন্দরটির বছরে যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা দাঁড়াবে আনুমানিক ২ কোটি ৪০ লাখে। ফলে ভবিষ্যৎ চাহিদা ও সম্ভাব্য সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেবিচক আরও বলেছে, ঢাকার দ্রুত নগরায়ণের কারণে শাহজালাল বিমানবন্দরের আশপাশে নতুন করে অবকাঠামো সম্প্রসারণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় একটি স্বতন্ত্র রানওয়ে নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া এবং বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঢাকার কাছাকাছি বিকল্প আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংস্থাটির পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
চুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি, তবে চূড়ান্ত অনুমোদন বাকি
গত ২৮ অক্টোবরের বেবিচকের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে দর-কষাকষি শেষ হয়েছে। তবে পরিচালনা চুক্তি তখনো চূড়ান্ত হয়নি। অন্যদিকে, *দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড* ও *দ্য ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেসের* সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত কয়েকটি বিতর্কিত শর্তে সম্মতি দিয়েছে। সংশোধিত চুক্তি জাপানি পক্ষের চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ফলে শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা ও প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে এগোলেও চুক্তির চূড়ান্ত রূপ এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায়।
এদিকে, আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনালের আংশিক কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও ব্যবহার শুরু না হওয়া এই অবকাঠামো চালুর প্রস্তুতি চলছে। তবে পরিচালনা চুক্তির চূড়ান্ত শর্তগুলো কী হবে এবং সেগুলো ভবিষ্যতের বিমানবন্দর পরিকল্পনায় কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখনো আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনাল চালুর মাধ্যমে শাহজালাল বিমানবন্দরের সেবা ও যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা বাড়বে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ঢাকার আশপাশে বিকল্প বিমানবন্দর চালুর ওপর ১৫ বছরের সীমাবদ্ধতা ভবিষ্যৎ বিমান পরিবহন পরিকল্পনায় কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যাত্রী চাহিদা যখন বিদ্যমান সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে, তখন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ ও বাণিজ্যিক চুক্তির শর্তের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নীতিনির্ধারকদের বড় চ্যালেঞ্জ।



