মূল কনটেন্টে যান
Thursday, 5 November 2026

যেখানে প্রমাণ কথা বলে...

The Evidence যেখানে প্রমাণ কথা বলে...

এইচএসসিতে ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাস, জিপিএ-৫ও আট বছরের তলানিতে

শিখনঘাটতি, শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা ও শিক্ষক সংকটকে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদরা; ফলের প্রকৃত কারণ জানতে গবেষণা এবং পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ নজরদারির পরামর্শ

FacebookWhatsAppX / TwitterTelegramLinkedInইমেইল

একসময় যেখানে পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর হতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেখানে এবার দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় পাসের হার ও সর্বোচ্চ জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা—দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর পাসের হার নেমেছে গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। আর মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডসহ ১১টি শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন, যা আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। সর্বশেষ ২০০৪ সালে এই হার ছিল এর চেয়ে কম—৪৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। পরের বছর, ২০০৫ সালে তা বেড়ে ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছায়। এবার ২২ বছর পর আবারও পাসের হার এত নিচে নেমেছে।

এবার সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেন ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন। তাঁদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন; অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৭ হাজার ২৮১ জন। ব্যানবেইসের ১৯৯০ সাল থেকে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এবারই সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।

মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড যুক্ত করে ১১টি বোর্ডের সামগ্রিক হিসাবে পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এবার মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। সে হিসাবে অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন; গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১।

শুধু পাসের হারেই নয়, সর্বোচ্চ ফল অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় পতন দেখা গেছে। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। ২০১৯ সালে ৪৭ হাজার ২৮৬ জন এবং ২০১৮ সালে ২৯ হাজার ২৬২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। অর্থাৎ ২০১৮ সালের পর এবারই সর্বনিম্নসংখ্যক শিক্ষার্থী এ কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।

এবারের ফলকে সন্তোষজনক মনে করছেন না শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি দূর করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

কেন কমল পাসের হার ও জিপিএ-৫?

ফলাফলের এই অবনতির পেছনে একাধিক কারণ দেখছেন শিক্ষাবিদরা। তাঁদের মতে, করোনা মহামারির কারণে তৈরি হওয়া শিখনঘাটতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা, নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়া, শিক্ষক সংকট এবং আর্থসামাজিক বৈষম্যের মতো সমস্যা শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলেছে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, গত কয়েক বছরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। করোনার সময় শিক্ষার্থীদের যে শিখনঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা পূরণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আগেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর সঙ্গে শিক্ষক সংকটসহ বিদ্যমান সমস্যাগুলো যুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

ফলাফলে আর্থিক ও ভৌগোলিক বৈষম্যের বিষয়টিও সামনে আনেন রাশেদা কে চৌধুরী। তাঁর পর্যবেক্ষণ, সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো শিক্ষার সুযোগ পেলেও গ্রামাঞ্চল ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষার মান ও সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ বৈষম্য কমাতে না পারলে সবার জন্য সমান শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

তবে ফল খারাপের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে অনুমাননির্ভর বিশ্লেষণের পরিবর্তে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান। তাঁর মতে, কোন বিষয়, কোন অঞ্চল কিংবা কোন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে পড়ছে, তা জানতে নমুনাভিত্তিক গবেষণা করা প্রয়োজন।

তিনি মনে করেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটার প্রভাব এবারের ফলাফলে পড়তে পারে। পাশাপাশি অতীতের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অতিরিক্ত উদারতা ছিল কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা দরকার। প্রকৃত যোগ্যতা অর্জন না করেও কোনো কোনো শিক্ষার্থী বেশি নম্বর পেয়েছিলেন কি না, তা যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করার পরও এইচএসসিতে অনেক শিক্ষার্থীর পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ইংরেজিতে দুর্বলতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হওয়ার পেছনে আগের স্তরের শিক্ষাগত ঘাটতি ভূমিকা রাখতে পারে। কলেজ পর্যায়ে তাঁরা প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহযোগিতা পাচ্ছেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা জরুরি।

ফল উন্নয়নে শিক্ষাবিদদের পরামর্শ

ফলাফলের এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক পর্যালোচনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান। যেসব কলেজে ২০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী পাস করেছেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের পরিবেশ ও শিক্ষার মান বিশেষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তাঁর মতে, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন কি না, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে কি না এবং শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন কি না—এসব বিষয় অনুসন্ধান করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামত নিয়ে সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা জরুরি।

শুধু খারাপ ফল করা প্রতিষ্ঠান নয়, শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিশ্লেষণের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের পরিচর্যা এবং একাডেমিক সহায়তার কোন বিষয়গুলো ভালো ফল অর্জনে ভূমিকা রেখেছে, তা চিহ্নিত করে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।

রাশেদা কে চৌধুরী ফল উন্নয়নে তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রথমত, যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, সেগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিত করতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গবেষণা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে না পারলে তার দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো যায় না। শিক্ষক সংকট, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কিংবা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—কোন বিষয়টি কতটা দায়ী, তা অনুসন্ধান করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগে শহর ও গ্রামের বৈষম্য কমাতে হবে। বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও সংকট দূর করার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, বিজ্ঞানসহ প্রতিটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের মাধ্যমে পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রস্তুতি নয়, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতটা শিখছে, সেটিই হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার মূল বিবেচনা।

তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ কাজে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের অভিভাবকদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা চিহ্নিত করলেই চলবে না; সেসব ঘাটতি পূরণে কার্যকর সহযোগিতাও দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে থাইল্যান্ডের উদাহরণ টেনে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সেখানে দুর্বল ফল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) মতো বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় এনে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়। এরপর এক থেকে দুই বছর ধরে সেসব ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করা হয়। বাংলাদেশেও শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ ধরনের বিশেষ সহায়তা ও তদারকির ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প পথের পরামর্শ

শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবার তাগিদ দিয়েছেন রাশেদা কে চৌধুরী। এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার সরকারি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি। তবে দুইয়ের বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্যও বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।

তাঁর পরামর্শ, এসব শিক্ষার্থীর জন্য স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা এবং কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না করলেও তারা নিজেদের দক্ষ করে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের পথে এগোতে পারবে। কোনো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া যেন একজন তরুণের কাছে জীবনের শেষ পরিণতি হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

সব মিলিয়ে এবারের এইচএসসি ফল কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা সাফল্যের হিসাব নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান, শিক্ষক সংকট, শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য এবং মূল্যায়নব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, সাময়িক পুনঃপরীক্ষার সুযোগ কিংবা কঠোর মূল্যায়ন দিয়ে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন শিখনঘাটতি পূরণ, মানসম্মত পাঠদান, দক্ষ শিক্ষক এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ধারাবাহিক সহায়তা।